এনজিও “অধিকার”-এর নিবন্ধন বাতিল নানা অসঙ্গতির কারণে

রবিবার, ১২ জুন ২০২২ | ৮:৫৩ অপরাহ্ণ | 28 বার

এনজিও “অধিকার”-এর নিবন্ধন বাতিল নানা অসঙ্গতির কারণে

বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অধিকার’ ১৯৯৫ সালের ২৫ মার্চ এনজিও ব্যুরো হতে প্রতিষ্ঠিত হয়, রেজিস্ট্রেশন নম্বর-০৯২৪। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়ে ত্রৈমাসিক ও বাৎসরিক প্রতিবেদন তৈরি করে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী ও পশ্চিমা দেশসমূহের দূতাবাস সমূহে প্রেরণ করে আসছে। এ ছাড়াও সমসাময়িক বিভিন্ন আলোচিত ইস্যুতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ হতে মন্তব্য ও বিবৃতি প্রদান করা হয়ে থাকে যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ অধিকারের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে নিজেদের প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও বিবৃতি করলেও অধিকারের প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও তথ্যের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অধিকার সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং মূল কর্ণধার আদিলুর রহমান খান অক্টোবর ২০০১- মে ২০০৭ পর্যন্ত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অধিকার এনজিওটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয় ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ ই মে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজত কর্মী সমর্থকদের সাথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে নিহতের তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ১০ই জুন অধিকার এই সংক্রান্ত বিষয়ে এক ফ্যাক্টস এন্ড ফাইন্ডিং রিপোর্ট তাদের ওয়েবসাইটে www.odhikar.org প্রকাশ করে যেখানে দাবি করা উক্ত সংঘর্ষে হেফাজতের ৬১ জন কর্মী সমর্থক নিহত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি পাওয়া যায়। যেমনঃ ৫ জন ব্যক্তির নাম একাধিকবার থাকা, ১১ টি কল্পিত নাম সংযুক্তকরণ, শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণকারীর নাম তালিকায় সংযুক্তকরণ, ঢাকার বাইরে মৃত্যুবরণ করা ৬ জনের নাম উক্ত তালিকায় যুক্ত করা ইত্যাদি। উক্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর উদ্ভূত বিভ্রান্তি দূর করতে তথ্য মন্ত্রণালয় হতে ১০/০৭/২০১৩ তারিখে তথ্য অধিকার আইনের অধীনে ‘অধিকার’ এর নিকট তালিকার বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার নির্দেশনা দেয়া হলেও অধিকার তা দিতে অনীহা প্রকাশ করে। এছাড়া এনজিও ব্যুরোকেও তারা গোপনীয়তার অজুহাতে উক্ত প্রতিবেদনের মূল তথ্যাদি প্রেরণ করেনি। ফলশ্রুতিতে ১০/০৮/২০১৩ সালে অধিকারের সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং-০১/২০১৩), যে মামলায় আদিলুর রহমান গ্রেফতার হয়ে পরবর্তীতে জামিন লাভ করেন। উক্ত মামলার কার্যক্রম বর্তমানে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।

‘অধিকার’ এর তরফ হতে ২০১৪ সালের ২৫ শে সেপ্টেম্বর এনজিও বিষয়ক ব্যুরো তে নবায়নের জন্য আবেদন দেয়া হয়। ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবকমূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন’ অনুসারে যেকোনো এনজিও পুনঃনিবন্ধন আবেদন যাচাই বাছাইয়ের সময়ে এনজিওটির পূর্ববর্তী ১০ বছরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার ভিত্তিতে সেটি সন্তোষজনক কিনা তা নির্ধারণ করা হয়। অধিকারের আবেদন পত্র যাচাই কালীন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মসহ নানাবিধ অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। এই প্রেক্ষিতে এনজিও ব্যুরো হতে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা তলব করে একাধিক চিঠি ইস্যু করা হয়। ‘অধিকার’ উক্ত চিঠিসমূহে যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদান করায় এনজিও ব্যুরো হতে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। এনজিও ব্যুরো কর্তৃক অধিকার এনজিওর কার্যক্রমের পর্যালোচনা করে নিন্মোক্ত অসংগতি সমূহ পাওয়া যায়।

বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবকমূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬ এর ৯(১) ধারা মতে কোন এনজিওকে বৈদেশিক মুদ্রায় অথবা দেশিয় মুদ্রায় প্রাপ্ত সকল বৈদেশিক অনুদানের অর্থ যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের (মাদার অ্যাকাউন্ট) মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারবে। উল্লিখিত আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংস্থাটি ০২ টি ব্যক্তিগত হিসাবসহ ০৮ টি হিসাব পরিচালনা করেছে।

অলাভজনক সংস্থা হিসেবে একটি এনজিও লাভজনক কোন খাতে বিনিয়োগ করতে পারেনা। কিন্তু ‘অধিকার’র এর প্রাপ্ত অনুদানের অর্থে আদিলুর রহমানের নামে একটি ব্যক্তিগত হিসাব খোলা হয় এবং ‘অধিকার’র অ্যাকাউন্ট থেকে উক্ত হিসাবে টাকা হস্তান্তর করে এফডিআর করা হয় যা বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামুলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন,২০১৬ এর সুস্পষ্ট লংঘন।

পুননিবন্ধনের আবেদনের সময় এনজিওটির আটটি অডিট আপত্তি বহাল ছিল।

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক অধিকারের ০৩ টি প্রকল্পে (1. Empowering women as community Human Rihts Defenders, 2. Education on the Convention against Torture and OPCAT Awarness. 3. Human Rights Research and Advocacy) নেতিবাচক কার্যক্রম এবং আর্থিক লেনদেনে অসংগতি বিষয়ে এনজিও ব্যুরোকে অবহিত করে। ব‍্যুরো পরবর্তীতে একাধিকবার তাদের নিকট উক্ত বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেও অধিকার সন্তোষজনক কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো পরিপত্রের ৮ ধারা অনুযায়ী এনজিও’র যেকোনো প্রজেক্ট স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সম্পন্ন করবে এবং প্রত্যেক বছর এবং প্রজেক্ট মেয়াদ শেষে স্থানীয় প্রশাসনে প্রজেক্ট রিপোর্ট জমা দিবে। কিন্তু অধিকার স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করণ অথবা প্রজেক্ট রিপোর্ট কিছুই জমা দেয়নি।

পরবর্তীতে অধিকার-এর কর্ণধার আদিলুর রহমান খান ২০১৯ সালের ১৩ ই মে, নিবন্ধন নবায়ন এর নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। আদালত ২৭ মে, ২০১৯ সালের মধ্যে এনজিও ব্যুরো নিকট হতে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা তলব করে। এনজিওগুলোর পক্ষ হতে ২৩ মে ২০১৯ সালের আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক জবাব প্রদান করা হয়। তবে অধিকার পক্ষের আইনজীবীর অনীহার কারণে প্রায় তিন বছর উক্ত রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিল মাস হতে উক্ত রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই অধিকার এনজিওটি গত ০৭ বছর ধরে তাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যে কোন এনজিওর কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্যাদি কার্যক্রম পরিচালনার অর্থের উৎস, সকল কার্যক্রম সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যাদি, কর্মরত ব্যাক্তি সংক্রান্ত তথ্যাদি, চলমান প্রকল্পের তালিকা ইত্যাদি নিয়মিত এনজিও বিষয়ক ব্যুরো নিকট প্রেরণের বাধ্যকতা থাকলেও অধিকার গত ০৭ বছরে তা প্রদান করেনি। এই বিষয়ে একাধিকবার এনজিও বিষয়ক ব্যুরো হতে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলেও আদালতে রিটের দোহাই দিয়ে তারা এনজিও বুড়োর সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ রক্ষা ছাড়াই বেআইনিভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে অধিকার পক্ষের আইনজীবী ধারাবাহিকভাবে আদালতের শুনানির তারিখ পরিবর্তন করে আসছেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ৫ জুন এনজিও বিষয়ক ব্যুরো হতে সুনির্দিষ্ট কারণ এবং ব্যাখ্যা উল্লেখপূর্বক ‘ অধিকার’ এনজিওটির নবায়ন আবেদন নামঞ্জুর করে চিঠি প্রদান করা হয়।

Development by: visionbd24.com