বিদ্যুত ও গ্যাসের অপচয় রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ | 65 বার

বিদ্যুত ও গ্যাসের অপচয় রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে সরকার যেখানে মিতব্যয়িতা ও রুটিন লোডশেডিংয়ের নানাবিধ পন্থা অবলম্বন করছে, তখনো সারাদেশে হাজার হাজার অবৈধ বিদ্যুত লাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুতের চুরি-অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা থাকলেও সারাদেশে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিক্সা যথেচ্ছভাবে চলাচল করছে।

অন্যদিকে, গ্যাস নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। গ্যাসের চুলায় রান্না নাগরিক জীবনে এনে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য। গ্যাস বেশি জ্বালালেও বিল নির্দিষ্ট। তাই সিংহভাগ ব্যবহারকারী গ্যাসের অপচয় রোধে বে-খেয়াল। কেউ কেউ কাপড় শুকাতে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখেন। আবার কেউ কেউ একটি ম্যাচের কাঠি ব্যবহার করবেন না বলেও দিন-রাত চুলা জ্বালিয়ে রাখেন। তাই এসব অপচয় রোধে জনসচেতনতা প্রয়োজন। সবাই সচেতন হলেই এ অপচয় রোধ সম্ভব।
জানা যায়, দেশের ৯০ ভাগ গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্য অবৈধ ঘোষিত ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা ও মিশুক চার্জ দেয়া হচ্ছে। ব্যাটারি চালিত ছোট যানবাহন পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে গ্যারেজের অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা সম্ভব হলে এসব গাড়ির চার্জ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। মূলত বিদ্যুত বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারির যোগসাজশে দেশে লাখ লাখ অবৈধ বিদ্যুত সংযোগ অবিচ্ছিন্ন রয়েছে। সরকারকে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত করে অর্থের বিনিময়ে অবৈধ সংযোগ দিয়ে এসব কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলছেন। বিদ্যুতের ঘাটতি পুরণে সাধারণ ভোক্তাদের মিতব্যয়ি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। সেই সাথে সরকারি অফিস আদালতে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পুর্ণতা অর্জন এবং শতভাগ বিদ্যুতায়নে সরকারের অভিষেকের পর এমন বিপর্যয় অনাকাঙ্খিত ও দু:খজনক। বিদ্যুতের অপচয় রোধ, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণসহ দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ নিলে এমন ঢালাও লোডশেডিংয়ের জনদুর্ভোগ কিছুটা কমিয়ে আনা এবং বিদ্যুত খাতের রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। বিশেষত বিদ্যুত খাতের দুর্নীতি, অপচয় ও অস্বচ্ছতা বন্ধের উদ্যোগ না নিয়ে সব দায় ও দুর্ভোগ সাধারণ ভোক্তাদের উপর চাপিয়ে সংকট উত্তরণে কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাবেনা। এ জন্য স্বচ্ছ, সমন্বিত ও বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে এই মুহুর্তে ঘাটতি কমিয়ে আনতে সর্ব ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতার পাশাপাশি বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের বিকল্প উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে এলএনজি ও ডিজেল নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার কারণে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা পরিপুরণে গ্যাস ও কয়লানির্ভর বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর উপর বাড়তি চাপ পড়ছে। ওখানে যাতে কোনো বিপর্যয় সৃষ্টি না সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বন্ধ থাকা বিদ্যুতকেন্দ্রগুলো যাতে তাৎক্ষনিক বা স্বল্প সময়ে চালু করা যায় যথাযথ রক্ষণাবেক্ষনের মাধ্যমে তার প্রস্তুতি থাকতে হবে।

যেনতেন প্রকারে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানিতে আমদানি নির্ভরতার কারণে আমাদের বিদ্যুৎখাতে হঠাৎ এই সংকট তৈরী হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপদনে সক্ষম, যা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোকে মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তকি দেয়া হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দেশীয় উৎস ও টেকসই উন্নয়নে পরিকল্পনামাফিক বিনিয়োগ করা হলে এমন সংকট হতো না। এখন দেশীয় গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই আমাদের মূল ভরসা হয়েে দেখা দিয়েছে। গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে তেমন কোনো সাফল্য নেই। দেশীয় পেট্টোলিয়াম কোম্পানী বাপেক্সকে শক্তিশালী করে এখাতে বিদেশি কোম্পানীর কারসাজি ও নির্ভরতার জিম্মিদশা কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল। গ্যাস ছাড়াও দেশীয় কয়লা উত্তোলন করে তা কাজে লাগানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে জ্বালানি বিভাগের অনীহা ও পশ্চাৎপদতা লক্ষ্য করা গেছে। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মান কাজ শেষ করে এর উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পাশাপাশি গ্যাস, কয়লা, পানিবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উন্নয়নে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। টেকসই নিরাপদ, নিরিবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য সরকারের পরিকল্পিত স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই মুহুর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থা চালু রেখে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ঠিক রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে, গ্যাস আমাদের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। অপ্রয়োজনে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা ঠিক নয়। গ্রাহকদের উদাসীনতায় প্রায়ই গ্যাস অপচয় এবং দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অকারণে চুলা জ্বালিয়ে রাখলে ব্যাপকভাবে গ্যাসের অপচয় হয়। গ্যাস অপচয়ের জন্য আমাদের সবার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। গ্যাস ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ, কো-চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি।

Development by: visionbd24.com